পথের শেষ

গলিটা হঠাৎ বোকার মতো শেষ হইয়া গিয়াছে। যেখানে শেষ হইয়াছে সেখানে কিছু খালি জায়গা, কিছু পুরানো ইটের স্তূপ, একটা ভাঙা দেওয়াল, আর উপরে খোলা নীল আকাশ। তার আগে শুধু এখানে-সেখানে সারি সারি টিনের ঘর, কয়েকখানা পুরানো একতলা বাড়ি, একটিমাত্র দোতলা বাড়ি, যার একতলার খানিকটা মাটির নীচে চলিয়া গিয়াছে। খোলা ড্রেন মাত্র একটি, কিন্তু খুব বড়ো, এত বড়ো যে একটা কুকুরের বাচ্চা দৈবাৎ একদিন সেখানে পড়িয়া সারা দিনে আর উঠিতে পারিল না, কেবল কেঁই কেঁই করিয়া কাঁদিল, ড্রেনের গা নখ দিয়া অনেক খুঁটিল, তারপর একদিন মরিয়া গেল। তারপর একদিন পেস্কারবাবু মথুরা চক্রবর্তীও মদের নেশায় শরীরের তাল ঠিক রাখিতে পারে নাই, হাতের সমস্ত খাবার নিয়ে ধড়াম করিয়া সেখানে পড়িয়া গিয়াছিল। ড্রেনের জলে সমস্ত শরীর ভিজিয়া গেল, ভাঙা কাঁচ ফুটিয়া হাত আর মুখেল খানিকটা কাটিয়া গেল। সেদিন পাড়ার মধ্যে একটা হৈ-চৈ। মথুরা চক্রবর্তী মদ খায় সত্য, কিন্তু এমন ঘটনা আর কোনো দিনও ঘটে নাই। সেই মথুরা চক্রবর্তী আজও রাত এগারোটার পর টলিতে-টলিতে বাসায় ফেরে, মুখের ঘা এখনও ভালো করিয়া শুকায় নাই।

এখন অঘ্রাণের শীত। একটু রোদ যা পাওয়া যায়, ঐ খালি জায়গাটাতেই। কিন্তু তার আগেই কারখানার বাঁশী বাজিতেই মধুসূদন, রাধানাথ আর গৌর পেছনে ধড়াম করিয়া দরজাখানা বন্ধ করিয়া তাড়াতাড়ি ভূতের মতো কারখানার দিকে হাঁটিতে থাকে। মধুসূদন আর রাধানাথ কাজ করে রেলওয়ে ওয়ার্কসপে, গৌর গ্লাস ওয়ার্কসে। গৌরের পায় কাঠের জুতা, দুইখানা হাত বুকের উপর রাখিয়া কাঠের খট্ খট্ শব্দ করিয়া শীতের মধ্যে ঠক্ ঠক্ করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে গৌর হাঁটিতে লাগিল। রোদ পোহায় শুধু বুড়া আর ছোটো ছেলেমেয়েরা। ছোটো ছেলেমেয়েদের মাথায় খালি জায়গাটা কিলবিল করিতে থাকে। তাহাদের গায়ে ভাঁজ-করা ময়লা কাপড়, সমস্ত শরীর গোল করিয়া ঢাকিয়া পিঠের দিকে বাঁধা। এছাড়া পরেশ, আর সুরেনের গর্ভবতী বৌও থাকে। পরেশের আজ তিন মাস হইল কাজ নাই, সুরেনের বৌ এইবার লইয়া তৃতীয়বার সন্তান প্রসব করিতেছে। তাহার কাঠির মতো শরীরে এক বিন্দু রক্ত নাই, পেটের ভারে ছোট মুখটা ছুটিয়া পড়িতে চায় যেন।

একদিন এ পাড়ায় একটা ক্যামেরার বাক্স কাঁধে করিয়া শিবনাথ আসিয়া হাজির। সে আগে এই পাড়াতেই থাকিত, কোনো কাজ তো ছিল না, ভবঘুরের মতো এখানে-সেখানে ঘুরিয়া বেড়াইত। আজ দেখি প্রকাণ্ড এক ক্যামেরা নিয়ে হাজির। সে জানাইয়া দিল, মাত্র সাত—সাত আনায় সে এক-একখানা পোস্টকার্ড সাইজ ফটো তুলিয়া দিবে, যার ইচ্ছা হয় তুলিয়া নাও, এত সস্তা আর কোথাও পাইবে না।

তাহার চারপাশে ভিড় করিল অনেকে, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরাই বেশি, তাহারা ভয়ানক চেঁচামেচি করিতে লাগিল, যার-যার মাকে ডাকিয়া আনিল। আর ভিড় করিল রাধানাথের মেয়ে মুকুল। মুকুল দৈবাৎ স্কুলে পড়িতেছে, এ পাড়ায় আর কোনো মেয়েই এমন পড়ে না। সে বিদ্যুতের মতো চলাফেরা করে, খরগোসের মতো এদিক-সেদিকে চাহিয়া বুকের কাপড় বার বার বুকের উপর টানিয়া সে এই আসে এই মিলায়। মাত্র পনেরোয় পড়িয়াছে। শিবু যদিও তাহাকে অনেক ছোটো দেখিয়াছে, কিন্তু কিছুতেই তুই বলিয়া ডাকিতে পারিল না, কিংবা তাহার চেহারার দিকে চাহিয়া এমন কথাও জিজ্ঞাসা করিতে পারিল না যে, সে-ও একখানা ফটো তুলিয়া নেয় না কেন? সে কেবল চোরের মতো চুরি করিয়া দেখিল কয়েকবার।

সুরেনের বৌকেও তাহার ছোটো মেয়ে কাপড় ধরিয়া টানিতে-টানিতে এদিকে আনিল, বায়না ধরিল সে-ও একটা ফটক না কী বলে তুলিবে। সুরেনের বৌ শিবুর ক্যামেরার বাক্সটা আর লাল বর্ডার দেওয়া কালো কাপড়টার দিকে কতোক্ষণ তাকাইয়া শেষে ক্লান্তস্বরে বলিল, পয়সা কোথায় পাবি বল্?

মেয়েটা তবু বায়না ধরিতে লাগিল। সকলের শেষে হন্তদন্ত হইয়া ছুটিয়া আসিল

লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আকর্ষণীয় মূল্য

এক বছর

৪৯৯

এক মাস

৯৯
মেয়াদ শেষে নতুন দামে নতুন করে গ্রাহক হতে হবে

যোগাযোগ করতে

+৮৮ ০৯৬০৬০৩৩৩৯৩
রবিবার–বৃহস্পতি: সকাল ১০টা–সন্ধ্যা ৬টা (সরকারি ছুটিরদিন ব্যতীত) অথবা ভিজিট করুন FAQ

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice